"গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে আধুনিক রাষ্ট্র ধনীক শ্রেণীর একনায়কত্ব ছাড়া অন্য কিছু নয়"- মার্কস
মার্কসীয় বীক্ষায় দেখতে গেলে আধুনিক রাষ্ট্র মূলত একটি শ্রেণীশোষণ যন্ত্র। গণতন্ত্র, সংবিধান ও আইনী ভাষার আড়ালে রাষ্ট্র ধনীক শ্রেণীর স্বার্থ সংরক্ষণের একটি সংগঠিত কাঠামো মাত্র অর্থাৎ শোষণ যন্ত্র। এই রাষ্ট্রের কাছে একজন শিল্পীর কী চাওয়া থাকতে পারে, কিংবা একজন কবি–সাহিত্যিক–শিল্পীমনা মানুষের কাছে রাষ্ট্রেরই বা কী চাওয়া থাকে—এই প্রশ্ন আপাতদৃষ্টিতে সরল হলেও এর ভেতর গভীর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিহিত।
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভোটের মাধ্যমে গুটিকয়েক ধনিকশ্রেণী কিংবা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ক্ষমতাচর্চার একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অধিদপ্তর বা সেক্টরের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নিজ নিজ শ্রেণী অবস্থান ও পদধারী অবস্থান অনুযায়ী মানুষের উপর ক্ষমতার প্রয়োগ করে। যেমন একজন প্রথম শ্রেণীর আমলা/কর্মকর্তা যে পরিসরে ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, একই কাঠামোর ভেতরে থেকেও একজন তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী তুলনামূলক সীমিত পরিসরে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। কিন্তু তারা উভয়েই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার যন্ত্রের অংশ। অর্থাৎ ক্ষমতা কেবল শীর্ষস্তরেই সীমাবদ্ধ নয় বড়ঙ দৈনন্দিন প্রশাসনিক আচরণ, ভাষা ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েও তা কার্যকর হয়। [ফুকো]
শুধু রাষ্ট্রীয় কর্মচারীরাই নয়—সরকারি জীবিকার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, সরকারদলীয় রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহও নিজ নিজ ক্ষমতাবলে একে অপরকে শোষণ করে চলেছে। এই শোষণকে বৈধতা দেওয়ার জন্য রয়েছে সংবিধান ও আইন।
আইন ও সংবিধান মূলত শাসক শ্রেণীর শোষণ কাঠামোকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যম। যদিও সংবিধানের মূল প্রস্তাবনা ও অনুচ্ছেদে একটা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব ও কর্তব্য লিপিবদ্ধ থাকে কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত/উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামো ও প্রয়োগের দিকে খেয়াল রাখলে বোঝা যায় সেসকল অধিকার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাগুজে লিখিত ঘোষণা ও প্রস্তবনার বাইরে বাস্তবরুপে প্রতিফলিত হয় না।
এই আইনি কাঠামো রক্ষার জন্য রাষ্ট্রের রয়েছে বিভিন্ন ধরণের বল প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান যা বাহিনী, ফোর্স ও ব্যাটালিয়ন নামে পরিচিত। এই বলপ্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের শক্তি যতটা না ব্যবহৃত হয় দেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণের স্বার্থে তার চেয়ে খুব দ্রুত ও খুব বেশি ব্যবহৃত হয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যে সরকার অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন তার শাসনের চিরন্তন শোষণ কাঠামো টিকিয়ে রাখার স্বার্থে।
বাংলাদেশের জুলাই–আগস্টে, ছাত্র–জনতার উত্তাল আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ভূমিকা এই বাস্তবতাকে নগ্ন করে তোলে। ইতিহাস বলে—রাষ্ট্রীয় বাহিনী কখনো স্বতঃস্ফূর্তভাবে গণমানুষের ক্ষোভের পক্ষে দাঁড়ায় না। রক্তপাত, জানমালের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ও পরিস্থিতির চূড়ান্ত অবনতির পর তারা তখনই জনতার পক্ষে দাঁড়ায়, যখন উপলব্ধি করে যে তারা যে শাসকের ক্ষমতা রক্ষা করছে, সেই ক্ষমতার পতন অনিবার্য।
যতক্ষণ ক্ষমতার কেন্দ্র শক্ত থাকে, শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত বাহিনী শাসকের পক্ষেই লড়ে। কিন্তু পরাজয় নিশ্চিত হলে হঠাৎ করেই ‘আমরাও জনগণের সন্তান’—এই টাইপ বয়ান উৎপাদনের মাধ্যমে তারা গণমানুষের ক্ষোভকে নিয়ন্ত্রণ করে কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে একদম নিয়ন্ত্রণ করে নেয়। যার ফলে আমরা বুঝতে পারি তাদের এই অবস্থান আসলে একটা কৌশলগত অবস্থান।
যেইটা আসলে উত্তাল সময়ে জনতার কাতারে এসে জনসম্মতি ও মানুষের কনসেন্ট ধরে রাখার জন্য বললেও পরবর্তীতে সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে মানুষ বুঝতে পারে এসব আসলে ক্ষমতার ধারাবাহিকতা রক্ষার একটি নতুন পদ্ধতি। অর্থ্যাৎ বলপ্রয়োগে ব্যর্থ হলে তখন রাষ্ট্র ও তার প্রতিষ্ঠান সম্মতি উৎপাদনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করে।
ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তক আন্তোনিও গ্রামসি বলেন,
“The State is the entire complex of practical and theoretical activities with which the ruling class not only justifies and maintains its dominance, but manages to win the active consent of those over whom it rules.” — Antonio Gramsci
❝রাষ্ট্র হলো সেই সব ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক কার্যকলাপের সমষ্টি, যার মাধ্যমে শাসক শ্রেণী শুধু তার আধিপত্য টিকিয়ে রাখে না, বরং যাদের উপর সে শাসন করে, তাদের সক্রিয় সম্মতিও আদায় করে নেয়।❞
অর্থাৎ রাষ্ট্র একদিকে দমন করে, অন্যদিকে সেই দমনের পক্ষে সম্মতিও উৎপাদন করে।
বহু দেশ দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করলেও দেখা যায়, স্বাধীনতার পর সেই একই সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামো নতুন শাসকের ছায়ায় পুনরায় সংগঠিত হয়। আমরা যাকে বলছি 'নতুন বোতলে পুরনো মদ'। পুরনো শাসক বিদায় নেয়, কিন্তু শোষণের যন্ত্র নিজেদের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করে আরও দৈত্য-দানব হয়ে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে।
কিন্তু এক্ষেত্রে একজন নিরস্ত্র কবি, সাহিত্যিক,শিল্পীর ভূমিকা কী?
গণমানুষের মুক্তির সংগ্রামে একজন শিল্পী, একজন কবির ভূমিকা অনিবার্য। কবি শোষণ কাঠামোর হেজেমনিক (আধিপত্যের) ভাষাকে ভাঙতে থাকেন তাঁর লেখায়, তাঁর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চেতনায়। কারণ কবি কে কেবল ব্যক্তিগত সংবেদনশীল সত্তা ভাবলে ভুল হবে; তিনি সমাজের ভেতর থেকে জন্ম নেওয়া এক ঐতিহাসিক চেতনা।
গ্রামসির ভাষায়—
“All men are intellectuals, but not all men have in society the function of intellectuals.”
“All men are intellectuals, but not all men have in society the function of intellectuals.”
[সব মানুষই বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার অধিকারী, কিন্তু সমাজে সবাই বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা পালন করে না।]
এই অর্থে কবি হয়ে ওঠেন একজন Organic Intellectual—যিনি শাসকের ভাষা নয়, শোষিত মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে রাজনৈতিক ভাষা নির্মাণ করেন।
এই কারণেই কবির কল্যাণকর রাষ্ট্র নির্মাণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় স্বয়ং রাষ্ট্র। রাষ্ট্র কবিকে দমন করে, ব্যর্থ হলে তাকে কিনে নিতে চায়। পুরস্কার, পদক, স্বীকৃতি—এইসব রাষ্ট্রীয় সুবিধা দিয়ে কবির ভাষাকে শুধু বিষণ্ণ, নিষ্প্রাণ ও নন্দনীয় করে গড়ে তোলার চেষ্টা করে। রাষ্ট্র কবির কাছে চায় তাকে নিজের শোষণ যন্ত্রের প্রকল্পের অংশ করে নিতে। কিন্তু কবি তো সেই চিরন্তন সত্তা—সে চায় মানুষ, বৈচিত্র্যময় প্রাণ প্রকৃতির ধ্বংসের বিপরীতে তাদের কল্যাণকর বিকাশের গতিময়তা।
তাই একজন কবি নিজের সত্তা ও যাবতীয় জীবন ও জগতের গভীর পাঠক। জীবন ও জগতের গভীর পাঠ নিয়ে দীক্ষিত হতে থাকেন সর্বদা। এবং কল্যাণকর রাষ্ট্র নির্মাণের ঐতিহাসিক দায় নিজ কাঁধে তুলে নেয় এবং ভাষার মধ্য দিয়ে তা প্রবহমান রাখে গণমানুষের নদীতে।
সহায়ক গ্রন্থ :
Marx, Karl & Engels, Friedrich. The Communist Manifesto. 1848.
Gramsci, Antonio. Selections from the Prison Notebooks. Translated by Quintin Hoare & Geoffrey Nowell Smith. International Publishers, 1971.
গ্রামসি ও তার রাষ্ট্র চিন্তা | আলতাফ পারভেজ
রাষ্ট্র ও ভাবাদর্শ | লুই আলথুসার। ভাষান্তর : আলতাফ পারভেজ
সহায়ক গ্রন্থ :
Marx, Karl & Engels, Friedrich. The Communist Manifesto. 1848.
Gramsci, Antonio. Selections from the Prison Notebooks. Translated by Quintin Hoare & Geoffrey Nowell Smith. International Publishers, 1971.
গ্রামসি ও তার রাষ্ট্র চিন্তা | আলতাফ পারভেজ
রাষ্ট্র ও ভাবাদর্শ | লুই আলথুসার। ভাষান্তর : আলতাফ পারভেজ
