চিন্তাকে আগুন দ্বারা হত্যার ফেরাউনি তৎপরতা || সাকিব শাকিল



চিন্তাকে আগুন দ্বারা হত্যার ফেরাউনি তৎপরতা

আগুনের বহু রূপ আছে। আগুন যেমন কোনো কিছুকে জ্বালিয়ে ভস্ম করে দিতে পারে, তেমনি আগুনের ভেতর দিয়েই অনেক বস্তু খাঁটিতে রূপান্তরিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখছিলেন—
❝অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা❞
অপরদিকে কাজী নজরুল ইসলাম লেখেন—
“প্রলয়ের নাচনে আমি বাজাই অগ্নি-ডমরু।”

অর্থাৎ আগুন কখনো শুদ্ধির প্রতীক, কখনো ধ্বংসের। মানবসভ্যতার শুরুতে আগুন আবিষ্কার ছিল বন্য পশু থেকে শুরু বিভিন্ন বিপদ থেকে রক্ষার হাতিয়ার। কিন্তু মানুষ যখন আগুনের আরও আধুনিক ব্যবহার রপ্ত করতে শিখলো তখন আগুনই হয়ে উঠলো ভয়, ভীতি, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার প্রতীক। যে আগুন শুরুতে ছিলো দেবতা কিংবা দেবতাতুল্য পরে তা হয়ে ওঠলো শয়তান; কখনো বা ক্ষমতার অস্ত্র, সন্ত্রাসের হাতিয়ার। ফলে আমরা পরিচিত হতে থাকলাম "অগ্নি দেবতা" থেকে 'অগ্নি-সন্ত্রাস' শব্দের। 

আগুন-সন্ত্রাসের মৌলিক ব্যর্থতা এখানেই যে আগুন দিয়ে মানুষ ও বস্তু ধ্বংস করা যায় কিন্তু মানুষের ভেতরে নিহিত যে চিন্তা আছে তাকে আগুন ধ্বংস করতে পারে না। বরং চিন্তা আগুনের চেয়েও বেশি সংক্রামক, বেশি প্রবাহমান। 

 ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনায় দেখা যায়—চিন্তাকে হত্যা করতে গিয়ে ক্ষমতা আগুনের আশ্রয় নিলেও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছে চিন্তার কাছেই। ক্যাথলিক খ্রিস্টান চার্চ জিওর্দানো ব্রুনোকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করেছিল, কিন্তু ব্রুনোর মহাজাগতিক চিন্তা চিন্তাশীল মানুষের মাঝে থেমে থাকেনি। জগত ও জীবন সম্পর্কে সেসব চিন্তা পরবর্তীতে আরও প্রচার ও প্রসারিত হয়েছে৷ 
 সেমেটিক ধর্মের নবী ইব্রাহিম (আ.)–কে প্রচলিত ধর্মব্যবস্থার বিরোধিতার কারণে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, কিন্তু তাঁর তৌহিদি চিন্তা পৃথিবীর নানা প্রান্তে বিস্তার লাভ করেছে। ফলে ইতিহাস প্রমাণ করে ব্যক্তি বা বস্তুকেই ধ্বংস করা যায় যায়, চিন্তার মূল কখনো উপড়ে ফেলা যায় না৷ 

ফলে এই চিন্তাকে যুগে যুগে কর্তৃত্ববাদী, স্বৈরাচারী মনস্তত্ত্বের ব্যক্তিমানসেরা ভয় পেয়েছে। চিন্তাকে রুখে দিতে ভয়-ত্রাস দমন-পীড়নের সাহায্য নিয়েছে। এই ভয়-ত্রাস দমন-পীড়নের রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার এক গভীর উদাহরণ আমরা পাই কোরআনের সূরা আল-কাসাসে। সেখানে ওহীর মাধ্যমে খোদা মিশরের স্বৈরাচারী শাসক ফেরাউনের রাষ্ট্রকাঠামোকে উন্মোচন করেন এইভাবে,

> “Indeed, Pharaoh exalted himself in the land and made its people into factions, oppressing a sector among them, slaughtering their [newborn] sons and keeping their females alive. Indeed, he was of the corrupters.”
— Shahih International (Al-Qasas 28:4)


এই আয়াতে ফেরাউনের চরিত্র শুধু একজন নিষ্ঠুর শাসক হিসেবে নয়, বরং একটি নিপীড়ক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতীক হিসেবে হাজির হয়।
আহসানুল বায়ানের তাফসিরে তাফসিরকারকগণ উল্লেখ করেন, সে সময়ের জ্যোতিষীরা ফেরাউনকে জানিয়েছিল—বনী ইসরাঈলদের মধ্যে এমন এক সন্তান জন্ম নেবে, যার হাতে ফেরাউনের কর্তৃত্ববাদী জুলুমিয়াত ও ফেরাউনের স্বৈরাচারী ব্যক্তিমানসের রাষ্ট্রব্যবস্থার পতন ঘটবে। 

এই সংবাদ ফেরাউনের মনে যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল, তা শুধুমাত্র নবী মুসা (আ:) ঘিরেই নয়; বরং তা ছিল একটি ভবিষ্যৎ চিন্তার বিরুদ্ধে ভয়। তাই সে বনী ইসরাঈলদের মাতৃগর্ভে জন্ম নেওয়া পুত্র সন্তানদের হত্যা করতে শুরু করে। কারণ সে জানে—ভবিষ্যৎ মানেই চিন্তার ধারাবাহিকতা।

এখানে মুসার আগমনকে কেবল একজন নবীর জন্ম হিসেবে দেখলে পাঠ অসম্পূর্ণ থাকে। বরং মুসার আগমনকে আমরা দেখতে পারি একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য সংগ্রামরত নৈতিক–রাজনৈতিক চিন্তার অভিভাবক রুপে। অর্থাৎ মুসা শুধুমাত্র একক ব্যক্তি নন; তিনি বনী ইসরাঈল জাতির মাতৃগর্ভে জন্ম নিতে থাকা একটি শুভ চিন্তার বাহক—ইনসাফ, মুক্তি ও মানবিক মর্যাদার চিন্তার প্রতীক।

এই চিন্তাই ফেরাউনী ব্যক্তিমানস তথা তৎপরতার পক্ষে ধারণ করা অসম্ভব ছিল। 
কারণ স্বৈরাচারী ও কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র টিকে থাকে ভয়, ত্রাস, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, জুলুম, বিভাজন ও দেহ-নিয়ন্ত্রণের উপর। সেখানে প্রশ্ন, ন্যায় ও মুক্তির কোনো জায়গা নেই। তাই চিন্তাকে দমন করতে গিয়ে সে আশ্রয় নেয় ধ্বংসের নীতি। 

ফলত ফেরাউনি হত্যা ও নিপীড়ন মুসার আগমন অর্থাৎ ইনসাফের নৈতিক–রাজনৈতিক চিন্তাকে বধ করতে পারেনি, বরং সেই নিপীড়নই ফেরাউনের পতনের নৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছে। শেষ পর্যন্ত খোদা সেই নিপীড়নকারী ফেরাউনের জুলুমিয়াতকে মিশরের নীল নদেই ডুবিয়ে দেন।

এই ফেরাউনি তৎপরতা যে শুধু ধর্মীয় কাহিনির মধ্যে সীমাবদ্ধ তা নয়।  বরঙ বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চিন্তাকে চিন্তা দিয়ে ফাইট দেওয়ার লড়াই জারি না থাকার কারণে এখানেও ঘটে সেই ইতিহাসেরই ফেরাউনি তৎপরতা। 

ফলে ফেরাউনের মতোই, এই তৎপরতার পেছনেও কাজ করে চিন্তাকে চিন্তা দিয়ে মোকাবিলা না করার স্পৃহা। 

কিন্তু ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—আগুন দিয়ে চিন্তাকে হত্যা করা বা চিন্তার যে বীজ মানুষের মননে সুপ্ত থাকে তাকে ধ্বংস করা  যায় না। ব্রুনো, ইব্রাহিম কিংবা মুসার মতো প্রতিটি চিন্তা নিজের বাহক বদল করে  আবার পুনরায় ফিরে আসে ইতিহাসের  ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওয়াক্তে বিভিন্ন আঙ্গিক নিয়ে উপস্থিত হয়। ফলে যারা  আগুনকে অপরের চিন্তাকে হত্যা করার অস্ত্র ভাবে, একদিন সেই আগুনই তাদের নৈতিক দেউলিয়াত্বের দলিল হয়ে দাঁড়ায়।